September 20, 2018

‘আগামী’বাংলাদেশে ভাগ্যবঞ্চিতদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে

হাকিকুল ইসলাম খোকনঃ  গোপালগঞ্জের একটি গ্রামের কেএসএন. ইন্সটিটিউটের ছাত্র-ছাত্রীদের ল্যাবরেটরি ওয়ার্কের জন্যে সপ্তাহে দুদিন ৬ মাইল দূরের একটি স্কুলের ল্যাবরেটরিতে যেতে হতো। গরিব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের এহেন নাজুক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে কেএসএন ইন্সটিটিউটে একটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করে দিয়েছে মার্কিন প্রবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘আগামী’।

বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষার পথ সুগম করে দিতে ২০০৩ সাল থেকেই কর্মরত অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আগামী’ এখন কাজ করছে বাংলাদেশী বংশোদ্ভ’ত সালমান খানের বিশ্বখ্যাত ‘ভিডিও টিউটোরিয়াল’ বাংলায় অনুবাদ করে সকল ছাত্র-ছাত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাশে দাঁড়িয়েছে আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং গ্রামীণ ফোন।

গত ১৫ জুন বুধবার নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে ‘আগামী’র সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন

‘আগামী’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ড. সাবির মজুমদার।

সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যে জাতিসংঘ উইমেন গিল্ডের কর্মকর্তা রানু ফেরদৌস বলেন, ‘২০০৭ সালের ভয়াবহ সিডর ঘূর্ণিঝড়ের পর একটি স্কুলের পুননির্মাণে যখন সহায়তা খুঁজছিলাম, সে সময় এগিয়ে এসেছিল ‘আগামী’। প্রতিষ্ঠানটির সাথে এভাবেই আমার পরিচয় ।’

সংস্থাটির কর্মকান্ড প্রসঙ্গে ড. সাবির বলেন, ‘আগামী একটি ইউ-এস রেজিস্ট্রিকৃত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও অনুদান-নির্ভর এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য দেশের দুঃস্থ ও দরিদ্র শিশুদের মধ্যে মৌলিক শিক্ষার প্রসার। শহরের বস্তি এলাকা বা দারিদ্র-পীড়িত গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোকে সহায়তা প্রদান, দুঃস্থ, দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাগ্রহনের সুযোগ বৃদ্ধি, স্কুলগুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষার উপকরণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ- এসবই ‘আগামী’র প্রধান কার্যক্রম।’

সাবির বলেন, ‘২০১৫ সালে আগামী’র প্রজেক্টের মধ্যে ছিল, ক. ১৮ টি স্কুলের ৯,৪০০ শিশুর জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা, খ. খান একাডেমীর ৯০০ এর বেশী ভিডিও টিউটোরিয়াল-এর বাংলা রূপান্তর, গ. ২০টি স্কুলে ট্যাবলেটের মাধ্যমে শিশুদের স্ব-শিক্ষার ব্যবস্থা, ঘ. স্কুলে বিজ্ঞান চিন্তার প্রসার ও এক্সপেরিমেন্ট-নির্ভর শিক্ষার প্রচলন ইত্যাদি।’

সাবির উল্লেখ করেন, ‘এসব স্কুল পরিচালনা, শিশুদের মধ্যে বই, খাতা, খাবার, পোশাক-আশাক ও অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ, স্কুলের বেঞ্চ, টেবিল-চেয়ার ও অন্যান্য ফার্নিচারের ব্যবস্থা, ঘর নির্মাণ ও পয়ঃশোধনাগার তৈরি, শিক্ষকদের বেতন, ভাতা ও ট্রেনিং প্রদান, বিজ্ঞানাগারের সাজ-সরঞ্জাম, রাসায়নিক দ্রব্য ও আনুষঙ্গিক উপকরন সরবরাহ এবং স্ব-শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ট্যাবলেট-কম্পিউটার সরবরাহ করছে ‘আগামী’।

২০০৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সিলিকন ভ্যালি খ্যাত সানফ্রান্সিসকো বে এরিয়ায় ৩ প্রবাসীর একেকজন ৫০০ ডলার করে মোট ১৫০০ ডলার দিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘আগামী’। সময়ের ব্যবধানে এর বর্তমান বার্ষিক বাজেট আড়াই লক্ষ ডলারের উপর। বাজেটের বড় অংশ আসে প্রবাসী বাংলাদেশীদের ব্যক্তিগত দান থেকে। কর্পোরেট গ্র্যাণ্ট ও ম্যাচিং ফান্ড এর মাধ্যমেও অংশ নিচ্ছে মেণ্টর গ্রাফিক্স, গুগল, ইবে, বাংলাদেশের ডিবিএল গ্রুপ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক-এর মত কিছু প্রতিষ্ঠান। ‘আগামী’র ক্রমবর্ধমান সাফল্য ও কার্যকারিতা দেখে গত কয়েক বছরে পার্টনারশিপ-এর হাত বাড়িয়েছে গ্রামীনফোন, সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, খান একাডেমী, এডিবি ও বিশ্ব ব্যাংক।

প্রশ্নোত্তর পর্বে এনআরবি নিউজের এক প্রশ্নের জবাবে ‘আগামী’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ড. মজুমদার আরো জানান, ‘আমরা সরকারী অনুমোদিত অথবা প্রতিষ্ঠিত কোন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর জন্যে কাজ করি না। আমরা করি বস্তি এলাকা কিংবা একেবারেই পিছিয়ে থাকা এলাকায় ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে চালু স্কুলের জন্যে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি আগামী’র আরেকটি বড় কাজ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বিশ্বখ্যাত অনলাইন শিক্ষার উদ্যোক্তা সালমান খানের ওয়েব সাইট ‘খান একাডেমী’র বাংলা সংস্করণ। গ্রামীণফোন, খান একাডেমী ও আগামী’র সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ বছরের মার্চ মাসে চালু হয়েছে বাংলা ওয়েব সাইট bn.khanacademy.org

মজুমদার উল্লেখ করেন, ‘৩য় থেকে ১০ম শ্রেণীর অংক বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সট বুক বোর্ডের কারিকুলাম অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১৮০০ ভিডিও টিউটোরিয়াল-এর বাংলা অনুবাদ করেছে ‘আগামী’। বাংলা ওয়েব সাইট-এর মাধ্যমে এসব টিউটোরিয়াল এখন বিনামুল্যে পাচ্ছে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা। প্রতি বছর কয়েকশো নতুন টিউটোরিয়াল-এর বাংলা রূপান্তর আগামী’র একটা বড় লক্ষ্য।’

বাংলাদেশে আগামী’র কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘আগামী এডুকেশন ফাউন্ডেশন’। ১২ জনেরও বেশি সার্বক্ষণিক কর্মী কাজ করছে ঢাকা-সহ বিভিন্ন অঞ্চলের স্কুলগুলোর দেখাশোনায়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আমেরিকায় আগামীর সবাই ভলান্টিয়ার, স্বেচ্ছাসেবী। এর সংখ্যা দুই শতাধিক। এরা মূলত তিনটি এলাকায় সংগঠিতঃ ১. আগামী সেন্ট্রাল – সানফ্রানসিসকো বে এরিয়া ও সারা আমেরিকা, ২. সাউথ-ইস্ট চ্যাপ্টার : ভার্জিনিয়া, ম্যারিল্যান্ড, ওয়াশিংটন ডিসি এবং ৩. নর্থ-ইস্ট চ্যাপ্টার- নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাট, পেনসিলভ্যানিয়া ইত্যাদি।

গত মাসে অনুষ্ঠিত হয় ‘আগামী’র সেন্ট্রাল ও সাউথ-ইস্ট চ্যাপ্টার-এর উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠান। সংবাদ সম্মেলনে নর্থ-ইস্ট চ্যাপ্টার-এর ডিরেক্টর অপারেশন্স শহীদ আহমেদ জানালেন যে, তাদের উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠান হবে আগস্টের ১৪ তারিখ নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যে।

আরেকটি অনুষ্ঠান হবে ২১ জুলাই ঢাকায় বনানীর লেকশোর হোটেলে। এভাবেই আগামীর তহবিল প্রদান করেন বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবায়ে আগ্রহী প্রবাসীরা।

সংবাদ সম্মেলনে নিউইয়র্কে সাপ্তাহিক বাঙালি পত্রিকার সম্পাদক কৌশিক আহমেদ ‘আগামী’র মহতী লক্ষ্য ও কর্মতৎপরতার কথা নিউজ মিডিয়ার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার আহ্বান জানান।

এ সময় আগামী’র নর্থ-ইস্ট চ্যাপ্টারের সভাপতি ড. মোহাম্মদ জামান রুকন, তহবিল সংগ্রহ সম্পর্কিত পরিচালক সৈয়দ ফজলুর রহমানও ছিলন।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ১৮ মে ২০১৬

Related posts