September 25, 2018

আকুথেরাপি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাঃ ফ্রি ক্যাম্পের আয়োজন

 ছবিঃ  আকুপ্রেসার/আকুথেরাপি চিকিৎসা

স্বপন পাল, ঢাকাঃ বাংলাদেশের সব গ্রাম-বাংলার চিত্র একই রকমের । ( কিছু গ্রামের চিত্র হয়তো আলাদা । যে গ্রামের উপর মন্ত্রি/এমপি-র নেক নজর পড়েছে অথবা উনাদের নেক (neck) ধরে কাজ করিয়ে নেয়া হয়েছে, সে সকল গ্রামের কথা আলাদা )। যে কোন গ্রামেই যাওয়া হোক না কেন, মনে হয় নিজের গ্রামে এসেছি। গ্রাম গুলোর মধ্যে মিল হল – খারাপ যাতায়াত ব্যবস্থা, বাজার না থাকা, স্কুল না থাকা, বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকা, চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকা, পানীয় জলের অভাব ইত্যাদি, ইত্যাদি এবং ইত্যাদি ।

ঢাকার নওয়াবগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রাম ‘বাহেরচর’। বাংলাদেশ কৃষক সমিতি এবং আকুপ্রেসার এন্ড রিফ্লেক্সলজি রিসার্চ সেন্টার –এর যৌথ আয়োজনে সম্প্রতি একটি ফ্রী চিকিৎসা সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি নয় । আকুথেরাপির সাহায্যে চিকিৎসা। টিম লিডার – আবিদ হোসেন–এর নেতৃত্বে আরও দুই জন আকুথেরাপিসট এই ফ্রী চিকিৎসা সেবায় অংশ নেন। জনাব মোবারক হোসেন এবং স্বপন পাল। (আবিদ হোসেন গত ১২ বছর আকুথেরাপি চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। মোবারক হোসেন, স্বপন পাল সহ অনেকে আবিদ হোসেনের কাছে ট্রেনিং প্রাপ্ত । তাঁর কথায় “আমি আবিদ হোসেন সাথে মোবারক হোসেন জন্টু,সিকিম আলী সকলেই কৃষক নেতা। সেই সাথে স্বপন পাল – একজন ভালো আকুথেরাপিস্ট, নবাবগঞ্জ উপজেলার বাংলাদেশ কৃষক সমিতি এবং আকুপ্রেসার এন্ড রিফ্লেক্সোলজি রিসার্স সেন্টার যৌথউদ্যোগে এই গ্রামের সরলপ্রাণ মানুষগুলোর স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য “ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প” এর আয়োজনে আজ সারাদিন বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাগ্রস্থ অর্ধ শতাধিক নারী -পুরুষ-শিশুর স্বাস্থ্যগত নানান সমস্যার সমাধান দেই। আকুপ্রেসার এবং পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনপ্রণালীর দিকনির্দেশনার মাধ্যমে।“ ) ।

গ্রামের নেতৃস্থানীয় লোক মিজান সাহেবের বাসার বৈঠকখানায় ফ্রী চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকা থেকে ৮-৪৫মিঃ বাসে করে বান্দুরা, তারপর অটোতে চড়ে গ্রামের কাছে। এরপর ১৫ মিঃ হাঁটা পথ পেরিয়ে মিজান সাহেবের বাসায়। তখন প্রায় ১১-৪৫মিঃ। এই হাঁটা পথটি মোটেই ভালো নয়। মাইকিং করে বলা হল,”ফ্রী চিকিৎসা দিতে ঢাকা থেকে ডাক্তার এসেছে, চিকিৎসা নিতে ইচ্ছুক সবাইকে মিজান সাহেবের বাসায় উপস্থিত থাকতে বলা হচ্ছে।“ একজন দুইজন করতে করতে প্রচুর লোক এল। অবশ্য নারীর সংখ্যা বেশী ছিল। কারণ, এই গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ কুয়েতে চাকুরিরত। তিন বছরের শিশু থেকে ৬৫ বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা উপস্থিত। তিনজন আকুথেরাপিসট একনাগাড়ে চিকিৎসা করে চলে। ১২ টা থেকে দুপুর ২-৩০মিঃ পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। আকুথেরাপি চিকিৎসা এই গ্রামের মানুষের কাছে নতুন এবং আশ্চর্যের ।

অধিকাংশ মানুষের গোড়ালিতে ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, কোমরে ব্যথা, কাঁধ ও ঘাড়ে ব্যথা এবং ঠাণ্ডা জনিত সমস্যা । কিছু পাওয়া যায় উচ্চ রক্তচাপের, কোষ্ঠকাঠিন্যের রুগী । হাতের নির্দিষ্ট পয়েন্টে প্রেসার দিলে ঘাড় ব্যথা, মাথাব্যথা, কাঁধ ব্যথা ভালো হচ্ছে । আবার পায়ের নির্দিষ্ট পয়েন্টে প্রেসার দিলে গোড়ালি ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা ভালো হচ্ছে। নিয়মিত ডাক্তার সেবা নিয়ে ও ঔষধ খেয়ে অধিকাংশের ব্যথা কমছে না। অথচ এই তিনজন হাত ও পায়ের কতকগুলি জায়গায় টিপাটিপি করে ব্যথা দূর করছে। গ্রামের মানুষ চমকিত এবং খুশি। তবে তাদের কেন খাবার ঔষধ দেয়া হল না এজন্য কিছু কিছু মানুষ হতাশ হয় । ঔষধ খাওয়াটা মানুষের মানসিক অবস্থার সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, সেই অবস্থা থেকে সরিয়ে আনতে সময় লাগবে বোঝা গেল । রক্তচাপ মাপার যন্ত্র দেখে সবাই একবার করে তাদের রক্তচাপ মেপে নিল। ৪-৫ জন মহিলার উচ্চ রক্তচাপ পাওয়া যায় । তাদের চিকিৎসা দেয়া হয়। শেষে খাবার, ঘুমানো ইত্যাদি সম্বন্ধে বিস্তারিত ভাবে উপস্থিত মানুষদের বুঝিয়ে দেয়া হয় ।

সর্বমোট ৫৫ জন অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। বিনা ফিতে অসুস্থ মানুষের সেবা করার মধ্যে যে আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না, এমন অভিমত তিনজনেরই।

গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ কৃষক। কৃষি কাজের সাথে যুক্ত মানুষগুলি ঘাড়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, হাঁটু ব্যথা এবং গোড়ালি ব্যথায় ভুগে। আবার ঘর সামলানোর কাজে যুক্ত মা-বোনদের হাতে ব্যথা, কাঁধে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা, গোড়ালিতে ব্যথা হয়। মনে হয় গ্রামের মানুষগুলি তাদের কাজের প্রভাবের দ্বারা ব্যথা অর্জন করে। ঔষধ এই ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে পারছে না। ( যদিও চিকিৎসা দেয়ার পর প্রত্যেককে শিখিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়, কিভাবে বিভিন্ন পয়েন্টে প্রেসার দিয়ে ব্যথা দূর করতে হবে । কিন্তু ব্যাপারটা অত সহজ না । )
সেজন্য প্রতিটি গ্রামে অন্যান্য চিকিৎসা সেবাদানকারীর পাশাপাশি যদি ১ জন করে আকুথেরাপিসট থাকে (নিদেনপক্ষে ২ টি গ্রামের জন্য ১ জন), তবে গ্রামের কর্মঠ মানুষগুলি আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবে । কেমিক্যাল ওষুধের প্রভাব থেকে এই কর্মঠ মানুষগুলিকে মুক্ত করতে পারলে আমাদের দেশের সব ভিত সব দিক দিয়ে শক্ত হবে। আর তাই জরুরী ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ভাবে Alternative Medicine হিসাবে আকুথেরাপি চিকিৎসাকে স্বীকৃতি প্রদান, আমাদের দেশের সকল জনগণের স্বাস্থ্য সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ।

Related posts