September 21, 2018

আকাশজয়ী নারী সেনাদের কথা

ঢাকাঃ  আমাদের নারীরা এখন আর সেই পুরনো যুগে আটকে নেই। বাইরের কাজে তারাও যে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই সেটা প্রমাণ করছেন বার বার। এমনই অনুপ্রেরণীয় দুই নারী মেজর নাজিয়া নুসরাত হোসেন ও মেজর শাহরীনা বিনতে আনোয়ার। আকাশজয়ী দুই নারী সেনাকে নিয়েই আমাদের মূল রচনা মেজর নাজিয়া নুসরাত হোসেন এবং মেজর শাহরীনা বিনতে আনোয়ার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে তারা প্রথম দুই নারী পাইলট। আকাশজয়ী এই গর্বিত দুই নারী সদস্য গত বছর তেজগাঁও আর্মি অ্যাভিয়েশন গ্রুপে শিক্ষানবিস পাইলট হিসেবে সফলভাবে প্রশিক্ষণ বিমান ‘সেসনা ১৫২ অ্যারোবাট-’এ একক ও দ্বৈত উড্ডয়ন পরিচালনা করেন। নাজিয়া ২০১৫-এর ৭ মে উড্ডয়ন দক্ষতা প্রমাণ করতে প্রথম একক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন। আর শাহরীনা একই বছরের ২১ মে প্রথম একক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন। আজ এই সফল দুই নারী সেনাকে নিয়ে আমাদের আয়োজন। লিখেছেন— জিন্নাতুন নূর

নাজিয়া নুসরাত হোসেনের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর। তার বাবা মোশাররফ হোসেন সরকারি চাকরিজীবী এবং মা লায়লা আক্তার বানু গৃহিণী। ১৯৮৯ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। নাজিয়ার ছোট ভাই আতাই রাব্বী। বাবার বদলির চাকরির কারণে নাজিয়াকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। এ কারণে নাজিয়ার বন্ধুও ছিল অগণিত। মেধাবী ছাত্রী নাজিয়া স্কুল-কলেজে বরাবরই মেধা তালিকায় ছিলেন। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী নাজিয়া মতিঝিল সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। তিনি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল থেকে স্লাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ ছাড়া ইঞ্জিনিয়ার কোরের বেসিক কোর্স সম্পন্ন করেন। নাজিয়া ২০০৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর ৬১তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে কমিশন লাভ করেন।

নাজিয়া জানান, স্কুলে থাকাকালীন মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন ও তিন গোয়েন্দার বই পড়তে পছন্দ করতেন। উচ্চ মাধ্যমিকে এসে অবশ্য রবি ঠাকুর ও শরত্চন্দ্রের বই তাকে আকর্ষণ করে। তিনি সব ধরনের গান শুনতে পছন্দ করেন। তবে টেইলর সুইফট ও বাংলা ব্যান্ডের গান তার বেশি পছন্দ।

শৈশবে দুরন্ত ছিলেন নাজিয়া। ছোট থাকতে একবার নানীবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নানীর হাতে থাকা চালের থালা ফেলে দিয়ে ভয়ে ড্রামের পেছনে লুকিয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু দীর্ঘ সময় নাজিয়াকে না পেয়ে পরিবারের লোকজন পুলিশে খবর দেন। পরে ঘুম ভাঙলে নাজিয়া বেরিয়ে আসেন।

ভবিষ্যতে কী হবেন এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো চিন্তা-ভাবনা না থাকলেও নাজিয়ার মা লায়লা আক্তার ছোট্ট নাজিয়াকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন মেয়ে বড় হয়ে একদিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। মেয়েকে সেনাবাহিনীর সবুজ ডোরাকাটা পোশাকে দেখার ইচ্ছা ছিল তার। মায়ের সে স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন নাজিয়া। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত যোগ দিলেন সেনাবাহিনীতে। তিনি বলেন, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম। সেই সময় পত্রিকায় সেনাবাহিনীর সার্কুলার দেখতে পাই। প্রচণ্ড ইচ্ছা থেকে সেনাবাহিনীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিই। যদিও সে সময় নাজিয়ার উচ্চ মাধ্যমিকের ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হয়নি। তবে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকায় নাজিয়া প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে সেনাবাহিনীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। নাজিয়া জানান, সুশৃঙ্খল জীবন তিনি পছন্দ করেন। কারণ তার মা-বাবাও সবসময় শৃঙ্খলা মেনে চলতেন। নাজিয়া বলেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের কোনো বিকল্প নেই।

নাজিয়ার পরিবারে তিনিই প্রথম সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যদিও নাজিয়ার স্বামী একজন সামরিক কর্মকর্তা, মেজর মাহমুদুর রহমান। সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর মাহমুদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেনাবাহিনীতে যোগদানের পেছনের কারণ জানতে চাইলে নাজিয়া বলেন, আমার কাছে সেনাবাহিনী একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। আমাকে এই পেশা আকর্ষণ করত। আমার মা সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য আমাকে বরাবরই সহযোগিতা করে এসেছেন।

তবে সেনাবাহিনীর প্রথমদিকে অভিজ্ঞতা নাজিয়ার কাছে কিছুটা কষ্টের ছিল। প্রথমদিকে কম ঘুমানোর জন্য কিছুটা আফসোস হয়েছিল তার। তিনি বলেন, আমাদের ব্যাচে আমরা ১৭ জন ছিলাম। সবাই একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও আগে থেকেই বিমান চালানোর বিষয়ে নাজিয়ার মনে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। নবম শ্রেণিতে থাকাকালীন ডিসকভারি চ্যানেলের বিমান উড্ডয়ন নিয়ে যে অনুষ্ঠানগুলো দেখানো হতো তা খুব কৌতূহল নিয়ে দেখতেন।

সেনাবাহিনীতে যোগদানের চার বছরের মাথায় এসে পাইলটের প্রশিক্ষণ নেওয়ার ব্যাপারে আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে জানাই। সে সময় আমার শ্বশুর মেজর (অব.) ওবায়দুর রহমান আমাকে উৎসাহ দেন।

অতঃপর দুই বছরের প্রশিক্ষণ শেষে সফলভাবে একক উড্ডয়ন করেন নাজিয়া। তিনি বলেন, আমার প্রশিক্ষক লে. কর্নেল রানা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। তবে প্রথম উড্ডয়নের সময় কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন তিনি। আকাশে উঠে কখন বিমান নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলেন তা টের পাননি। সে সময় নাজিয়া ছিলেন মাটি থেকে এক হাজার ফুট উঁচুতে। কিছুটা ভয় কাজ করলেও নাজিয়া বলেন, আমার মনে হচ্ছিল আমি পারব। যদিও প্লেন ল্যান্ড করার বিষয়টিকে অনেক ক্রিটিক্যাল মনে হচ্ছিল কিন্তু আমি সফলভাবে অবতরণ করি। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নাজিয়া জানান, পুরোপুরি প্রশিক্ষণ শেষ করতে তাদের আরও কিছুটা সময় লাগবে। বর্তমানে তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরে আর্মি অ্যাভিয়েশনের কার্যালয়ে নাজিয়া এবং তার আরেক সহকর্মী শাহরীনার প্রশিক্ষণ চলছে।

তিনি বলেন, দিন ও রাতে বিমান চালানোর মধ্যে পার্থক্য আছে। রাতের আকাশ থেকে নিচের আলো ঝলমলে শহর দেখতে অন্যরকম লাগে। রাজশাহীতে রাতে বিমান চালানোর সুযোগ হয়। সেটি ছিল ব্যতিক্রমী এক অভিজ্ঞতা।

অ্যাভিয়েশন নিয়ম অনুযায়ী আকাশে ১২০ ঘণ্টা উড্ডয়ন করতে পারলে তাকে প্রাথমিক পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য সনদ দেওয়া হয়। এই সাক্ষাত্কার গ্রহণকালে নাজিয়া ৭৮ ঘণ্টা এককভাবে বিমান চালনায় অভিজ্ঞতা সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি বলেন, একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে পাইলটের অভিজ্ঞতা থাকাটা আমার পেশায় বাড়তি সুবিধা যোগ করবে।

যে মেয়েরা সেনাবাহিনীর মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় আসতে চান তাদের জন্য পরামর্শ হিসেবে নাজিয়া বলেন, অবশ্যই পড়ালেখা করতে হবে। এ জন্য একজনের ইচ্ছাশক্তি থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, অভিভাবকদের উচিত ছেলেমেয়ে যে পেশায় আগ্রহী তাকে সেই পেশার ব্যাপারে উৎসাহিত করা। যদি পরিবার, শ্বশুরবাড়ি এবং জীবনসঙ্গীর সঙ্গ পাওয়া যায়, তবে সেনাবাহিনীর পেশায় মেয়েদের ভালো করার সুযোগ আছে।

এই মেজর বলেন, আমি সেনাবাহিনীতে থেকে যা করছি তা দেশের জন্য। আমার পেশার মাধ্যমে কোনো না কোনোভাবে দেশের সাহায্য করছি। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করি। কারণ একজন সেনাসদস্য যতটা দেশের সেবা করার সুযোগ পান তা অন্য পেশাজীবীরা পান না। তার মতে, সেনাবাহিনী হচ্ছে এক ধরনের জীবনব্যবস্থা। এটি একটি পরিবার। এখানে আমাদের সিনিয়ররা বাড়ির অভিভাবকদের মতো আমাদের শাসন করেন।

নাজিয়ার প্রিয় খাবার ভাত-ভর্তা। চকোলেটও দারুণ পছন্দ। তার প্রিয় পোশাক সালোয়ার-কামিজ। আর সুযোগ পেলে প্রাকৃতিক যে কোনো পরিবেশে ঘুরতে তার ভালো লাগে। বিশেষ করে পাহাড়ঘেরা সিলেট ও চট্টগ্রাম তার খুব প্রিয়।

জীবনের স্মরণীয় একটি দিনের ঘটনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে যেদিন সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট থেকে লেফট্যানেন্ট হই সেদিনটি আমার কাছে অন্যরকম একটি দিন। আমাকে সেদিন যখন র্যাংক পরানোর সময় সিনিয়ররা অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন সেদিনের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

নাজিয়ার কাছ থেকে জানা যায়, সেনাবাহিনীতে ছেলে-মেয়েদের একই ধরনের প্রশিক্ষণ চলে। মেয়েদের প্রশিক্ষণের সময় তাদের সহযোগিতা করা হয়। নাজিয়া বলেন, প্যারাট্রুপিং-এ বাংলাদেশের মেয়েরা অল্প সময়ে অনেক এগিয়ে গেছে। আশা করছি ভবিষ্যতে এ পেশায় মেয়েরা আরও বেশি আসবেন।

অবসর সময়ে শুক্র-শনিবার নাজিয়া তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে সময় কাটান। এ ছাড়া বই পড়ে এবং ইংরেজি আর্ট মুভি দেখে অবসর কাটান। যে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান বা বিয়ের অনুষ্ঠানে তিনি শাড়ি পরেন। রান্নাবান্নায় তেমন আগ্রহ নেই তার।

সাতক্ষীরার মেয়ে শাহরীনা বিনতে আনোয়ারের বাবা আনোয়ারুল হক চিংড়ি ঘেরের ব্যবসায়ী এবং তার মা আর্জুসা আনোয়ার গৃহিণী। শাহরীনা তার মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। তার জন্ম ১৯৯০ সালের ২৩ জানুয়ারি। তিনি সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এইচএসসি পাস করেন। স্কুলজীবনে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান ছিল শাহরীনার। তিনি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল থেকে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ ছাড়া অর্ডিন্যান্স কোরের বেসিক কোর্স সম্পন্ন করেন। এর সঙ্গে গোলাবারুদ-সংক্রান্ত কোর্স অ্যামুনিশন টেকনিক্যাল অফিসার্স কোর্স, অফিসার্স উইপেন, ইউ এন লজিস্টিক কোর্সও সম্পন্ন করেন।

নানীর বাড়ি যশোর ক্যান্টনমেন্টের কাছে হওয়ায় ছোটবেলায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের পোশাক দেখে এই পেশার প্রতি সম্মান ও আগ্রহ তৈরি হয় শাহরীনার। আর বোধ হওয়ার পর থেকেই তিনি একজন সেনাসদস্য হতে চেয়েছিলেন। প্রথম যেবার সেনাবাহিনীতে মেয়েদের নিয়োগ শুরু হয় তখন থেকেই এই পেশায় যোগদানের ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হয় তার মনে। শাহরীনা বলেন, আমার কাছে সেনাবাহিনীর পোশাকটা ছোটবেলা থেকেই অনেক ভালো লাগত। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আমি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিলেও সেনাবাহিনীতে পরীক্ষা দিই। অবশ্য দুই জায়গাতেই সুযোগ পান তিনি। শাহরীনার পরিবারের কেউই এর আগে সেনাবাহিনীতে ছিলেন না। প্রথমে সেনাবাহিনীর পরিবেশ কেমন হবে এ নিয়ে শাহরীনা ও তার পরিবারের কিছুটা দ্বিধা ছিল। এমনকি প্রথমদিকে প্রশিক্ষণের সময় বেশ কষ্ট করতে হয় তাকে। তিনি জানান, প্রথম যেদিন তিনি এককভাবে বিমান উড্ডয়ন করেন সেদিনটি ছিল সবচেয়ে স্মরণীয়।

স্কুল-কলেজে থাকাকালীন সময়ে সাংস্কৃতিক চর্চা করতেন শাহরীনা। কিন্তু খেলাধুলায় তেমন একটা আগ্রহ না থাকায় বি. এম.-এর প্রশিক্ষণ তার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মেজর আরিফ (অব.) স্যারের তত্ত্বাবধানে তিনি খেলাধুলা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। আন্তরিক প্রচেষ্টায় এক সময় দৌড়ে ভালো করেন। এ জন্য তাকে অতিরিক্ত সময় দৌড়ের প্রশিক্ষণ করতে হতো।

শাহরীনা জানান, তার অনুপ্রেরণা মা-বাবা। তাদের কাছ থেকেই তিনি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যাপন করতে শিখেছেন। তিনি বলেন, আমার মা-বাবা সে সময় সাতক্ষীরা থেকে প্রতি সপ্তাহে প্যারেন্টস ডে’তে চট্টগ্রামে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতেন। শাহরীনা ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বিয়ে করেন। তার স্বামী ফ্লাইট লে. খালিদ উর রহমান বর্তমানে বিমান বাহিনীতে কর্মরত। তিনি জানান, সেনাবাহিনী ঘিরেই তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

পাইলট হওয়া প্রসঙ্গে শাহরীনা বলেন, আমার কাছে মনে হয় প্রত্যেকটি মানুষই উড়তে চায়। আমিও এই চিন্তা থেকে ওড়ার চেষ্টা করি। আর আমার সামনে যখন পাইলট হওয়ার সুযোগ আসে তখন আমি তা হাতছাড়া করিনি। অবশ্যই আকাশে ওড়ার জন্য আমার সহকর্মীরা আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আর আমার প্রশিক্ষক কর্নেল বাকী এবং লে. কর্নেল আনোয়ার আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। মা-বাবা তার ছোট শিশুকে যেভাবে হাঁটতে শেখান সেভাবেই আমাকে প্রশিক্ষকরা সবকিছু শিখিয়েছেন। প্রথম যেদিন আমি একক প্রচেষ্টায় বিমানের ইঞ্জিন স্টার্ট দেই সেদিন আমার মধ্যে ভয়, টেনশন ও আনন্দানুভূতি একসঙ্গে কাজ করছিল। এতদিন আমার স্যারদের প্রচেষ্টায় বিমান উড়িয়েছিলাম কিন্তু এবার একাই নিজেকে বিমান ওড়াতে হবে। স্যারদের এতদিন যেভাবে রিপোর্ট করেছিলাম সেদিনও ভয় কাটানোর জন্য একইভাবে স্যারদের বিমান থেকে রিপোর্ট করছিলাম। আমার প্রশিক্ষক আনোয়ার স্যার আমাকে মেঘ দেখে ভয় না পাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। আর পাখি দেখলে এড়িয়ে যেতে বলেছিলেন। এ ছাড়া চোখ-কান সজাগ রাখা এবং টাওয়ার ইন্সট্রাকশন মেনে চলার পরামর্শ দেন। তবে এককভাবে বিমান উড়িয়ে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। ভয়ও কেটে যায়। আমি মাটি থেকে সাত হাজার ফুট উপরে অবস্থান করছিলাম। এরই মধ্যে আকাশে উড্ডয়নের ৮০ ঘণ্টা সম্পন্ন করেছি। শাহরীনা বলেন, রাতে বিমান চালানোর মধ্যে আলাদা অনুভূতি আছে। সে সময় আকাশ থেকে পুরো শহর দেখতে অন্যরকম লাগে। আকাশে উঠে মনে হয়েছিল আকাশের বুকে আমিও একটি পাখি।

শাহরীনা জানান, বিমান চালানোর প্রশিক্ষণের সময় আমাদের বিভিন্ন ফ্লায়িং পদ্ধতির মধ্যে জেনারেল ফ্লায়িং লেগ, ইন্সট্রুমেন্ট ফ্লায়িং লেগ, নেভিগেশন লেগ, নাইট ফ্লায়িং লেগ, আইএফআর রুট ফ্লায়িং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি জানান, যে তরুণীরা সেনাবাহিনীতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী তাদের মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস দুটোই থাকতে হবে। আর এই পেশায় নিজেকেই নিজের চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তবে আমি ছেলে না মেয়ে এটি ভেবে কখনো পেশা ঠিক করা যায় না। আমার মা-বাবাও আমাকে প্রতিপালনের সময় মেয়ে হিসেবে ট্রিট করেননি। এমনকি বিয়ের পর আমার শ্বশুর-শাশুড়িও আমাকে পেশাগত বিষয়ে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। আমি যখন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে যাই তখন সারাদিন কী কী হলো তারা আগ্রহ নিয়ে আমার কাছে জানতে চান। এমনকি আমার শ্বশুর-শাশুড়ি পত্রিকায় প্রকাশিত আমার ছবি ও সংবাদ সংগ্রহ করে রেখেছেন। তারা পরিচিতদের তা গর্ব করে দেখান।

এই পাইলট বলেন, এখন যেহেতু ফ্লাই করছি স্বামী বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দেন। খাওয়া-দাওয়া ও অফিশিয়াল রুটিন এসব ব্যাপারে আমাকে নানা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করছেন।

শাহরীনা জানান, বিজ্ঞানবিষয়ক উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে। সিনেমা তেমন একটা দেখা হয় না। ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। এ ছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, ছবি আঁকা ও আবৃত্তির চর্চা ছিল ছোটবেলা থেকেই। এমনকি ছবি আঁকার জন্য স্কুলে থাকতে জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ ও রৌপ্য পদকও পেয়েছেন।

শাহরীনার প্রিয় পোশাক সালোয়ার-কামিজ। মাঝে মধ্যে শাড়িও পরা হয়। সাদা ভাত ও ফাস্ট ফুড তার প্রিয় খাবার। আর ব্যাগে সবসময় চকোলেট ও চিপস জাতীয় খাবার রাখতে পছন্দ করেন।

তিনি বলেন, আমি খুব ভালো কফি বানাতে পারি। ব্যাচম্যাটরা আমার বানানো কফির প্রশংসা করেন। এই পাইলটকে পাহাড় ও সমুদ্র আকর্ষণ করে। এ ছাড়া গ্রামের মেঠোপথ ও বনও তার কাছে প্রিয়। অবসরে ছবি আঁকতে পছন্দ করেন।

দেশ বলতে শাহরীনা তার ‘মা’কে বোঝেন। আর যে কোনো মূল্যে আমার দেশকে রক্ষা করতে হবে। এমনকি এর জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত তিনি। শাহরীনার মতে, মানুষের সেবা করার অনেক পথ আছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী একটি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Related posts