November 13, 2018

‘আইএস রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার গোপন নথি ফাঁস!

সরকারি বিভাগ ও কোষাগার স্থাপন, নিজেদের সমৃদ্ধ করতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরিসহ ইরাক ও সিরিয়া মিলে একটি একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সুন্নিপন্থী সশস্ত্র সংগঠন আইএস যে নকশা প্রণয়ন করেছে তা হাতে পাওয়ার দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

বিশ্লেষকদের মতে, আইএস-এর নামে যেসব নকশা ফাঁস হয়েছে সেগুলো সঠিক হলে পশ্চিমা বিশ্বের নীতি নির্ধারকদের উচিত হবে সেগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া। আইএস-কে তথাকথিত মনোবিকারগ্রস্ত হত্যাকারীর ছাঁচে ফেলে অবহেলা করা ঠিক হবে না বলেও সতর্ক করেছেন তারা। কেননা, নকশা অনুযায়ী ইতিমধ্যে আল কায়েদাকেও ছাড়িয়ে গেছে আইএস।

সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইএস’র নকশাটি ফাঁস হয়েছে বলে দাবি করে গার্ডিয়ান। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, ২৪ পৃষ্ঠার ওই নথিতে পররাষ্ট্র-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, প্রপাগান্ডা বিষয়ক অভিযান পরিচালনা এবং তেল, গ্যাস ও অথনীতিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করেছে আইএস। এ ছাড়া আঞ্চলিক সরকার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে সশস্ত্র সংগঠনটির। গার্ডিয়ানের দাবি, গত বছর ‘প্রিন্সিপলস ইন দ্য অ্যাডমিনিস্টেশন অব দ্য ইসলামিক স্টেট’ নামে এ ম্যানুয়েলটি তৈরি করে আইএস।

আইএস-এর বিভিন্ন নথিপত্র নিয়ে গবেষণাকারী আয়মেন আল-তামিমির কাছ থেকেই কথিত নীল নকশাটি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে গার্ডিয়ান। আইএস-এর সঙ্গে কাজ করছেন এমন এক ব্যবসায়ীর কাছ তামিমি সে নকশাটি পেয়েছেন বলেও দাবি সংবাদমাধ্যমটির। আইএস’র নিয়ন্ত্রণে থাকা বড় প্রদেশগুলোর একটির অর্থনৈতিক বিবৃতিসহ প্রায় ৩০টি নথি ফাঁস করেছেন ওই ব্যবসায়ী। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে নথি ফাঁসকারী ব্যবসায়ীর তথ্য জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে গার্ডিয়ান কর্তৃপক্ষ।

কী আছে ওই নকশায়?

সরকারি বিভাগ সংগঠিত করা

গার্ডিয়ানের দাবি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৮ জুন আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদি ইরাক ও সিরিয়ায় খেলাফত ঘোষণা করার পর, শিক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প-কারখানা, পররাষ্ট্র সম্পর্ক, জনসম্পর্ক এবং সামরিক ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কিভাবে ওইসব এলাকায় সরকারি কাজে নিয়োজিত বিভাগগুলো সংগঠিত করা যাবে সে পরিকল্পনার স্কেচ করে আইএস। ২০১৪ সালের জুলাই আর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে করা পরিকল্পনা অনুযায়ী কিভাবে নিয়মিত যোদ্ধাদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে তারও উল্লেখ রয়েছে নথিতে।

নতুনদের প্রশিক্ষণ

নতুনদের অস্ত্র ব্যবহারের আধুনিক সব কলাকৌশল, সামরিক পরিকল্পনা এবং সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কৌশল শেখাতে প্রতিবছর কোর্স পরিচালনারও পরিকল্পনা রয়েছে আইএস-এর। শত্রু কোন কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং কিভাবে তা প্রতিহত করা যাবে সে ব্যাপারেও যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা উল্লেখ আছে নকশায়।

আল কায়েদাকে ছাড়িয়ে

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নথিতে আইএস তাদের সামরিক ক্যাম্প স্থাপনের জন্য যে প্রশাসনিক বিভাগের নকশা করেছে তা নাইন ইলেভেন হামলার সময় আফগানিস্তানে আল-কায়েদার যে সক্ষমতা ছিল তাকে ছাড়িয়ে গেছে।

টার্গেট যখন শিশু যোদ্ধা

প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, আইএস সবসময় শিল্পকলার ছলে যুদ্ধশিক্ষা দিতে শিশুদের বেছে নেয়। চলতি বছর আইএস যেসব প্রচারণা চালিয়েছে সেখানে শিশুদের ড্রিল করতে, বন্দিদের ওপর গুলি চালাতে দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি।

আবু আবদুল্লাহ নামের এক মিসরীয়র লেখা নথিতে দেখা যায়, শুরুতে হালকা অস্ত্র বহনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে শিশুদের। পরে তাদের মধ্য থেকে দক্ষতার ভিত্তিতে চেকপয়েন্টে টহল দেওয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করার জন্য বেছে নেওয়া হবে।

ছোট করে না দেখার পরামর্শ

গবেষক তামিমির মতে গত এক বছরে তিনি আইএস’র যে ৩শ নথি পেয়েছেন তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘মৌলবাদী চেতনায় একটি টেকসই রাষ্ট্র গঠন করাই আইএস-এর মূল লক্ষ্য। অনন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া তাদের মূল লক্ষ্য নয়।’

এদিকে ইরাকে ২০০৬ সাল-২০০৮ সাল পর্যন্ত আইএস’র পূর্বসূরী সংগঠনকে ধ্বংসকারী সামরিক ইউনিটের প্রধান (অব) জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টালের মতে নকশাটি ঠিক হয়ে থাকলে এটিকে এখনই পশ্চিমা নীতি নির্ধারকদের গুরুত্ব সহাকারে নেওয়া উচিত এবং নকশাটি সবার দেখা উচিত। আইএস-কে বিকারগ্রস্ত হত্যাকারী হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও সতর্ক করেন তিনি।

নতুন প্রকাশিত নকশার ব্যাপারে জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক শার্লি উইন্টার বলেন ‘নথিটি পূর্বপরিকল্পনাকারী হিসেবে আইএস-এর উচ্চপর্যায়ের সক্ষমতাকেই প্রকাশ করছে।’

সূত্র: গার্ডিয়ান
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts