November 16, 2018

অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক স্তর নিয়ে নানা প্রশ্ন?

ঢাকাঃ  অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক স্তর চালু করায় দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কি এখন থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হবে? যে হাই স্কুলগুলোতে অষ্টম শ্রেণী আছে, সেগুলো কি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিণত হয়ে গেল? মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর কি শুধু নবম আর দশম শ্রেণী?_ গত বুধবার থেকে এমন নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা। সারাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের মধ্যে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও বিতর্ক চলছে।

সমকালের পক্ষ থেকে শিক্ষা সংক্রান্ত দুটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে কিছু প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের জবাব এখনও মেলেনি। মন্ত্রী ও সচিবরা জানিয়েছেন, বাস্তবায়ন শুরু হলে প্রশ্নগুলোর জবাব মিলবে।

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, নতুন সিদ্ধান্ত অনুসারে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান হয় এমন এমপিওভুক্ত ৫৫৩ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এমপিওভুক্ত নয়, এমন ১ হাজার ৮২৮টি নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান এখন থেকে এ মন্ত্রণালয়ই দেখভাল করবে। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবেই পরিচালিত হবে। চাইলেই তারা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত চালু করতে পারবে না, এর জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নতুন শ্রেণী-শাখা খোলার পূর্বানুমোদন নিতে হবে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, কেবল নবম-দশম শ্রেণী নয়, মাধ্যমিক স্তর হবে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত খুলতে গেলে তাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এখন থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকবে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ক্লাস, পরীক্ষা, সিলেবাসসহ সব বিষয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখবে। ওই মন্ত্রণালয় ঠিক করবে, কীভাবে তারা এ কাজগুলো বাস্তবায়ন করবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সিদ্ধান্ত হয়ে গেলেও এখনও কিছু আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠিয়ে তার অনুমোদন নেওয়া হবে। প্রয়োজনে মন্ত্রিসভারও অনুমোদন নেওয়া হবে।

গত বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভায় প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাংবাদিকদের এ কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। তারা এ সিদ্ধান্তকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেন। মন্ত্রিপর্যায়ের এ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই প্রশাসনিক বাস্তবায়ন শুরু হবে।

সরকারের এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই মুহূর্তে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা কতটুকু সেটি দেখতে হবে। এত বড় চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মতো প্রস্তুতি ও সক্ষমতা কতটুকু আছে, তা মূল্যায়ন হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বিষয় হচ্ছে, প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পুরো প্রাথমিক স্তরে নতুন করে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত নতুন পাঠ্যবই প্রণয়নের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে হয়নি। দুই স্তরের পাঠ্যক্রমে সেতুবন্ধন রচনা করা হবে- নাকি ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠ পরিবর্তন করা হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। সম্প্রসারিত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পাঠ্যক্রম তৈরির জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবিতে)। এ কমিটির অভিমত হলো, দুই স্তরের শিক্ষাকে এক স্তরে নিতে হলে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তকগুলো সব আবার নতুন করে তৈরি করতে হবে। প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, নতুন এ ব্যবস্থায় একটি স্কুলকে নানা সিদ্ধান্তের জন্য দুই মন্ত্রণালয় ও দুই অধিদপ্তরে ছোটাছুটি করতে হবে। এতে হয়রানি আরও বাড়ল।

প্রাথমিক শিক্ষকরা বলছেন, সব জায়গায় শিক্ষক সংকট তীব্র। আছে অবকাঠামোগত সংকট। তাদের প্রশ্ন, এ অবস্থায় অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত কীভাবে চলবে? শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কীভাবে চলবে?

অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক স্তর বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি কীভাবে হবে? কোন মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি দেবে? এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন খালিদ সমকালকে জানান, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপ্রাপ্ত ২ হাজার ৩৮১টি নিম্নমাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে আসবে। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ৫৫৩টি। একাধিক সূত্র জানায়, দেশে ১৯ হাজারের মতো মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। এসব বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলে যায়, তাহলে ওইসব স্কুল কি শুধু নবম ও দশম শ্রেণী দিয়ে চলবে, নাকি তারা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী খুলে বসবে? এসব প্রশ্নের এখনও কোনো মীমাংসা হয়নি। আবার যেসব কলেজ শুধু একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী নিয়ে গঠিত, এগুলোর কী হবে? এগুলো কি কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হবে, নাকি সেখানে নবম ও দশম শ্রেণী খোলা হবে? প্রাথমিক শিক্ষা অধিকার সুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান সমকালকে বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বর্তমান শিক্ষক দিয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করানো। কারণ প্রাথমিকে অনেক শিক্ষক এসএসসি ও এইচএসসি পাস। তারা কীভাবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করাবেন, তাও বড় প্রশ্ন।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ২০১০ সালের শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তে সরকার কেন গেল তা জানা নেই। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রথমেই সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে চলে আসবে। প্রস্তুতি ছাড়া এটি বাস্তবায়ন করলে তিন স্তরের শিক্ষায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।

এ বিষয়ে বুধবারের বৈঠকে অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আখতারুজ্জামান সমকালকে বলেন, এটি একটি বড় কর্মযজ্ঞ। এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এর মধ্যে ক্লাস পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিলেবাস প্রণয়ন, কর্মমুখী সিলেবাস করাসহ আরও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে।

পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণী শেষে বর্তমানে চালু থাকা সমাপনী পরীক্ষা দুটি থাকবে কি-না এ প্রশ্ন এখন সবার মাঝে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, প্রতিটি প্রশ্নের জবাবই ধীরে-সুস্থে মিলবে। বাস্তবায়ন শুরু হলে আস্তে-ধীরে সব সমস্যার সমাধান দেওয়া হবে।সমকাল

Related posts