December 13, 2018

অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট অবহেলিত বেসরকারি শিক্ষকদেরকে চরম হতাশ করেছে:

আজিজুর রহমান আযম
সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ, লক্ষ্মীপুর জেলা শাখা।

শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। সারা দুনিয়াতে আর এমন একটি পেশা নেই যা সম্মানের দিক থেকে শিক্ষকতা পেশার সমান। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশ নেত্রী শেখ হাসিনা সব সময় শিক্ষকদের সোনার মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। তাঁরই সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার ফসল ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি। সমগ্র জাতি আশা করে বর্তমান সরকার সেই শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করবেন। কিন্তু বর্তমানে সারা দেশের মানুষ কী দেখতে পেল যে দেশের ৯৮ শতাংশ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে শিক্ষা দানকারী অবহেলিত এম.পিও ভূক্ত বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারীদেরকে গত ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের গেজেটে অন্তভূক্ত করা হয়নি। যা এদেশের বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় ৬ লক্ষ শিক্ষ কর্মচারীদেরকে চরম ভাবে হতাশ করেছে ও তাঁরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছে।

তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ লক্ষ্মীপুর জেলার দালাল বাজার ডিগ্রী কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারুক আহমেদ (৪০) এই ঘটনা শুনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বদ্ধ হয়ে এই দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়েছেন। ১৯৮০ সাল থেকে বেসরকারী শিক্ষকরা পে-স্কেলে অন্তর্ভূক্ত হয়ে আসছে। অথচ এবারই প্রথম পে-স্কেলের গেজেটে বেসরকারী শিক্ষকদের সমএর্ক একটি শব্দ ও যুক্ত করা হয়নি। এটি চরম হতাশাজনকই শুধু নয়, শিক্ষকেরা বর্তমান সরকারের এই কর্মকাণ্ডে তীব্র ভাবে ক্ষুব্ধ ও বিক্ষুব্ধ। এটি হতে পারে না প্রকাশিত গেজেট দেশের সব শিক্ষক সমাজ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এমনিতেই দেশে সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষক সমাজের মধ্যে পদোন্নতি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান। উদাহরণ স্বরূপ দেখা যায় বেসরকারী শিক্ষকরা বাড়ী ভাড়া পান ৫০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে বাড়ী ভাড়াতো দূরের কথা বাড়ীর বারান্দাও ভাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। এবং চিকিৎসা ভাড়া পান ৩০০ টাকা তা নিতান্তই অপ্রতুল এবং উৎসব ভাতা পান স্ব-স্ব স্কেলের ২৫ ভাগ। বেসরকারী স্কুল কলেজ মাদ্রাসার শিক্ষক কর্মচারীরা কোন শিক্ষা ভাতা, টিপিন ভাতা ও পাহাড়ি ভাতাও পান না।

পুরো চাকুরী জীবনে মাত্র একটি ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পদোন্নতির কোন সুবিধা ব্যবস্থা নেই। যেমন- বেসরকারী কলেজে এমন অনেক মেধাবী শিক্ষক/শিক্ষিকা আছেন যাদের এসএসসি থেকে অনার্স মাষ্টার্স পর্যন্ত অনেক বিষয়ে প্রথম শ্রেণী প্রাপ্ত এবং তাদের অনেকেই আবার এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রীর অধিকারী হয়েও পদোন্নতিতে অনুপাত থাকার কারণে সহকারী অধ্যাপক হতে পারেন না। তাদের এত উচ্চ মানের ডিগ্রী থাকার পরও ট্র্যাজিডিটা হলো তাঁদের অনেক হতভাগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাকে পুরো চাকুরী জীবনে প্রভাষক হিসেবে জীবন কাটিয়ে দিতে হয়। বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির কোন সুব্যবস্থা না থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন এই সম্মানিত পেশায় আসতে চরম অনীহা প্রকাশ করেন।

পৃথিবীর কোন উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে এমন তুঘলকী প্রথা আছে বলে আমাদের জানা নেই। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের কথা হয়তো নাই বললাম। আমাদের সার্কভূক্ত পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল, মালদ্বীপসহ অন্যান্য আনুপাতিক যে ভাতা দেন তা আমাদের দেশ থেকে কয়েকগুণ বেশী।তাই অনতিবিলম্বে বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীদের অভিক্ষতা,যোগ্যতা ও মেধার সমণ¦য়ে বিভাঘীয় ভাবে পদোন্নতির ব্যবস্থা গ্রহণ ও চাকরি বদলি যোগ্য করা প্রয়োজন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আর এস দেবনাথ দেশের একটি বিশিষ্ট দৈনিকে তাঁর এক নিবন্ধে লিখেছেন- ভারতের একজন হাইস্কুলের শিক্ষক তাকে জানালেন নির্দিষ্ট ডিগ্রী নিয়ে হাইস্কুলে একজন শিক্ষক সেইখানে যোগদান করলেই ২০-২৫ হাজার ভারতীয় রুপি পান। যা চাকুরীতে যোগান করলে বাংলাদেশের একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকও পান না, তাই এই স্বাধীন দেশের একজন শিক্ষক যখন তার জন্য নির্ধারিত বেতনের মাধ্যমে পরিবারের ভরণ পোষণ ব্যবস্থা না পেয়ে হতাশায় আত্মহত্যা করেন। কিংবা এই মহান পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবন জীবিকার তাগিদে অন্য কোন অসম্মানের পেশায় জড়িয়ে যান। তখন স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত হওয়ার কথা।

এই জন্য অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করতে তাদের রাষ্ট্রীয় ভাবে অবশ্যই সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্ত নিশ্চিত করতে হবে। তবেই দেশে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরী হবে এবং যোগ্য সুনাগরিক প্রত্যাশা করা যায়।
বর্তমান সরকারকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে একটি দেশ, জাতি ও সমাজ তার ভবিষ্যত প্রজন্মকে যে বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, দক্ষতা ও নৈতিকতা বোধ নিয়ে গড়ে তুলতে চান সেই কাজটা সম্পন্ন করেন সম্মানিত শিক্ষক বৃন্দরা। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার ও জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবি-কাঠি। শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন ব্যতিরেকে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়।সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এবং ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যেম আয়ের দেশে উন্নীত করতে হলে দেশে দক্ষ মানব সম্পদ অবশ্যই সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষার গুনগত উন্নয়ন ব্যতিরেকে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার অধিকার পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হলে জনসাধারণের অন্যান্য অধিকার আদায়ের পথ সুগম হবে।

অথচ স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমাদের সংবিধানে শিক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। শিক্ষা মৌলিক অধিকার না হওয়ার কারণে মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘনের দায়ে রাষ্ট্র বা সরকারকে আইনগত বাধ্য করা যায় না বা তার বিরদ্ধে মামলা করা যায় না। মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ অর্থাৎ- হেফাজত করার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের, যা সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে এবং এই মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ১০২ (১) বিধান মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মামলা করতে পারবে।

আইনগত অধিকার না থাকায় বেসরকারী শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য অষ্টম পে-স্কেলে শর্তহীন ভাবে অন্তরভুর্ক্তির জন্য রাষ্ট্রের করুণার ওপর নির্ভর করতে হয়। অষ্টম পে-স্কেলে বে-সরকারী শিক্ষকদেরকে অন্তর্ভূক্তি না করায় তাদের রাষ্ট্র, সমাজ পরিবার সহ সকল পেশার মানুষের নিকট হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এবং এতে সম্মানিত শিক্ষক সমাজ খুবই অপমানিত বোধ করছেন। অথচ মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষকদের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বেতন স্কেল দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আসছেন। কিন্তু তাঁর এই ঘোষণা ঘোষণা হিসাবেই থাকলো, আলোর মুখ দেখল না।
এইখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, দক্ষ ও সফল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বর্তমান সরকার সমাজের সকল স্তর ও চিন্তার মানুষের মতামত গ্রহণ করে জাতির প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গী-আকাংখা ও লক্ষ্যের প্রতিফলন ঘটিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করেছেন।

কিন্তু একই সরকার কেন তা দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে পারছে না তা অবশ্যই গুরত্ব দিয়ে দেখতে হবে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে এমপিও ভূক্ত বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য না থাকায় হতাশা ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক নেতারাও। বেসরকারী সব শিক্ষক সংগঠন সরকার সমর্থক বিরোধী দল সমর্থক শিক্ষা নেতারা বলেছেন এ গেজেটে এমপিও ভূক্তি বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়টি অন্তভূক্ত করা হয়নি। এতে তারা সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো পে-স্কেল বাস্তবায়নের দিন থেকে বেতন ভাতা পাচ্ছে না।

অর্থাৎ- এমপিও ভূক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা আগের বেতনক্রম অনুসারেই আগামী (ডিসেম্বর ১৫) মাসের বেতন ভাতা পাবেন। আর সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ডিসেম্বর মাসের বেতন পাবেন নতুন বেতন স্কেল অনুসারে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে এম.পিও ভূক্ত বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবে। এরপর অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে। এতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, প্রায় ৬ লাখ শিক্ষকের বর্তমান পে-স্কেলের অন্তভূক্তিকে আমলাতান্ত্রিক ম্যারপ্যাচে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তা না হলে অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন- নতুন করে টাকার সংস্থান করতে হবে না। কারণ বাজেটেই এই টাকা বরাদ্দ রাখা আছে।

বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের নিকট বিনীত অনুরোধ দেশের ৯৮ শতাংশ শিক্ষাদানকারী বেসরকারী শিক্ষক সমাজকে কোন শর্তের বেড়াজালে ফেলে পে-স্কেলের বাইরে রাখার কোন পদক্ষেপ নিবেন না। অবিলম্বে বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীদেরকে জাতীয় পে-স্কেলে অন্তর্ভক্তি করে বকেয়া সহ আগামী জানুয়ারী থেকেই জাতীয় পে-স্কেল দিতে হবে।

এর ব্যত্যয় ঘটলে মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মত হবে। সারা দেশের প্রায় ৬ লক্ষাধিক শিক্ষক তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য স্কুল কলেজ মাদ্রাসায় তালা ঝুলিয়ে দিয়ে রাস্তায় নেমে আসবে এবং বর্তমান সরকারের এই অযৌক্তিক ও হটকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রবল জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলবে। কারণ শিক্ষকদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেলে তারা পিছু হটবে না সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে অনুমান করা যায়। শিক্ষকদের এই আন্দোলনের সাথে তাদের প্রিয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক সহ দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ শিক্ষকদেরকে মৌন সমর্থন দিবে। তা বর্তমান সরকারের জন্য কখনোই সুখকর হবে না। তাহলে সরকারকে পুরো বিব্রত কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

Related posts