September 20, 2018

অপব্যবহার চলছেই এমপিদের স্টিকারের!

এমপিদের স্টিকার

‘সংসদ সদস্য’ ও ‘সংসদ সচিবালয়’ লেখা স্টিকারের অপব্যবহার চলছেই। গাড়িতে এ সব স্টিকার লাগিয়ে অস্ত্র-মাদক চোরাচালানসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে, মাদক ও চোরাকারবারির ১০টি চালানের মধ্যে তিনটির ক্ষেত্রেই গাড়িতে জাতীয় সংসদের স্টিকার লাগানো থাকে। এর বাইরে সংসদের স্টিকারযুক্ত গাড়ি ব্যবহার করে মহানগরীতে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল না মানাসহ ট্রাফিক আইনভঙ্গের ঘটনা অহরহ দেখা মেলে। তবে সংসদের স্টিকারের অপব্যবহার রোধে জাতীয় সংসদ সচিবালয় পিন কোড-সংবলিত নতুন স্টিকার চালু করা হয়েছে। সংসদ সচিবালয় আশা করছে নতুন স্টিকার সরবরাহের পাশাপাশি পুরনো স্টিকারগুলো তুলে নেওয়া সম্ভব হলে এ ধরনের অপব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হবে। জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সচিবালয়, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি দফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদবি যুক্ত স্টিকার গাড়িতে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে জড়িত হওয়ার ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। কখনও-কখনও প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। তবে, মর্যাদার বিচারে অনেকটা ‘প্রভাবশালী’ ও স্টিকারপ্রাপ্তি অনেকটা ‘সহজলভ্য’ হওয়ায় সংসদ সদস্য ও সংসদ সচিবালয়ের স্টিকার গাড়িতে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংসদ সচিবালয়ের জন্য খুবই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অবহিত করার পাশাপাশি সংসদ সদস্যরাও সংসদের বৈঠকে একধিকবার উল্লেখ করেছেন।

সর্বশেষ সোমবার জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দশম সংসদের অষ্টম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে সংসদ সদস্যদের স্টিকারের অপব্যবহারে উদ্বেগ প্রক্শ করে রওশন বলেন, আমরা সাড়ে তিনশ সংসদ সদস্য রয়েছি। কিন্তু সংসদ সদস্যদের স্টিকার ব্যবহার করে সাড়ে ৫ হাজার গাড়ি চলাচল করছে। কারা এই স্টিকার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্ত্রাসীরাও তো ঘুরে বেড়াতে পারে, এর প্রতিকার করতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতা এ সময় সংসদ সদস্যদের স্টিকারের অপব্যাবহার রোধ করতে দূতাবাসের আদলে এমপিদের দুটি করে বিশেষ নম্বর প্লেট দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

প্রসঙ্গত, বিরোধীদলীয় নেতার দাবি মতে, রাজধানীতে সংসদ সদস্যদের স্টিকারযুক্ত গাড়ির সংখ্যা সাড়ে ৫ হাজার হলেও আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর মতে, এর সংখ্যা আরও বেশি। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের হিসাব মতে, রাজধানীসহ সারাদেশে জাতীয় সংসদের স্টিকারযুক্ত প্রায় ৯ হাজার গাড়ি রয়েছে। বর্তমান সংসদের এমপিদের পাশাপাশি অনেক সাবেক এমপি, এমপিদের ব্যক্তিগত সহকারী, দলীয় নেতাকর্মী ও আত্মীয়স্বজনের গাড়িতেও ব্যবহার হচ্ছে সংসদ সদস্য অথবা জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের স্টিকার। এই সুযোগে অনেক সন্ত্রাসীরা গাড়িতে ‘নকল’ স্টিকার ব্যবহার করে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংসদ সচিবালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ৩৫০ এমপি ও তাদের পরিবারের জন্য একটি করে মোট ৭০০সহ সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের ৬৩টি এবং পরিবহন পুলের প্রায় ১০০টি গাড়ির জন্য মোট ৮৬৩টি স্টিকার সরবরাহ করার কথা।

জানা গেছে, সংসদ সচিবালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কয়েকজন কর্মচারী টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন সময় সংসদ সদস্য ও সংসদ সচিবালয় নামের স্টিকার সরবরাহ করে। এ ক্ষেত্রে তারা স্টিকার প্রতি ১০০ থেকে ৫০০শ টাকা করে নেয় বলে সূত্র জানিয়েছে। এ অভিযোগের কারণে একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে জানা গেছে। এসব স্টিকার বিতরণ বন্ধে সংসদ সচিবালয়ের নজরদারি বৃদ্ধি ও নতুন স্টিকার চালু হওয়ার ফলে বর্তমানে এগুলো অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। তবে, বিভিন্ন স্থান থেকে এগুলোর ফটোকপি বা নকল তৈরি করে ব্যবহার এখনও চলছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানায়।

সংসদ সদস্যদের স্টিকারের অবব্যবহার নিয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে সংসদে আলোচনা হয়। গত ২৮ জানুয়ারি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সংসদ সদস্যদের স্টিকার ব্যবহার করে অনেক গাড়ি চলে। এসব গাড়িতে ভুয়া এমপিরা থাকেন। কখনও কখনও বাড়ির কাজের লোকও স্টিকার ওয়ালা গাড়ি ব্যবহার করেন। তারা ট্রাফিক আইন মানে না। রং সাইট দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেন। নীলক্ষেতেও সংসদ সদস্যদের স্টিকার কিনতে পাওয়া যায় বলেও তিনি ওই দিন মন্তব্য করেন।

পরদিন ২৯ জানুয়ারি বিএনএফ সদস্য আবুল কালাম আজাদও জাতীয় সংসদে বিষয়টি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী নতুন স্টিকার সরবরাহের সিদ্ধান্তের কথা জানান। জাতীয় সংসদের একটি হলোগ্রামযুক্ত ইস্যু করা নতুন স্টিকারে তার গাড়ির নম্বর এবং একটি কোড নম্বর থাকবে। যেন ইস্যুকারী কর্তৃপক্ষ সহজেই শনাক্ত করতে পারে এটি কার গাড়ি এবং কে ব্যবহার করছেন। যা নকল করা সম্ভব হবে না। তিনি জানান, সংসদ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য একটি এবং তাদের পরিবারের জন্য ব্যবহার করার জন্য ভিন্ন রঙের একটি মোট দুটি স্টিকার সরবরাহ করা হবে।

সংসদ সচিবালয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই থেকেই সংসদ সচিবালয় নতুন এ স্টিকার সরবরাহ শুরু করেছে। জানা গেছে, অপব্যবহার বন্ধে এবার স্টিকার এমপি বা তাদের প্রতিনিধিদের হাতে দেওয়া হচ্ছে না। কেবল নির্ধারিত ফরমে আবেদনের পর সংসদ সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস শাখার কর্মকর্তারা গিয়ে স্টিকার গাড়িতে লাগিয়ে দিচ্ছেন। একইভাবে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের গাড়ির জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে দেওয়া হচ্ছে ‘সংসদ সচিবালয়’ লেখা স্টিকার। অবশ্য এখনপর্যন্ত সব এমপির কাছে এটা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি এবং পুরনো স্টিকারগুলোও প্রত্যাহার করা যায়নি বলে সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে।

নতুন স্টিকারের নিরাপত্তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্টিকারটিতে জাতীয় সংসদের একটি হলোগ্রাম রয়েছে, আর স্টিকারের নিচে বিআরটিএর একটি পিন কোড রয়েছে। যে এমপির নামে স্টিকার ইস্যু করা হচ্ছে, তার নাম ও গাড়ির নম্বর বিআরটিএ-এর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার পরিবারের সদস্যদের ও সংসদের কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত গাড়ির স্টিকারের পিন কোডও বিআরটিএসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানো হচ্ছে। একইভাবে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত গাড়িতে ‘সংসদ সচিবালয়’ লেখা স্টিকার লাগিয়ে দিচ্ছে সংসদের নিরাপত্তা বিভাগ। এসব স্টিকারেও নির্ধারিত পিন কোড থাকছে এবং পিন কোডসহ গাড়ির নম্বরগুলো বিআরটিএসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সংসদ সদস্য ও সংসদ সচিবালয়ের স্টিাকারের অপব্যহারের কথা স্বীকার করেন সংসদ সচিবালয়ের সচিব আশরাফুল মকবুল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার তিনি বলেন, স্টিকারের কিছু অপব্যবহার ও জালিয়াতির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ কারণে আমরা তা রোধে হলোগ্রামযুক্ত নতুন স্টিকার চালু করেছি এবং এগুলো সংসদ সদস্যদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তবে, এখনও পুরনো স্টিকারগুলো তুলে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হবে। সবার মাঝে নতুন স্টিকার সরবরাহের পাশাপাশি পুরনো স্টিকার তুলে নেওয়া সম্ভব হলে স্টিকারের অপব্যবহার ও জালিয়াতি বন্ধ হবে বলে আমরা আশা করছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মুসলেহ উদ্দিন (ট্রাফিক) বলেন,সংসদ সদস্যদের নামে ভুয়া স্টিকার ব্যবহার করে কেউ গাড়ি চালাচ্ছেন কি না, অনেক সময় তা পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। এটা ঠিক আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সংসদ সদস্যদের স্টিকার দেখে সেটা আসল না নকল তা যাচাই করতে কিছুটা বিব্রত বোধ করেন। ফলে স্টিকারযুক্ত গাড়ি দেখলে অনেক ক্ষেত্রে তল্লাশি করা সম্ভব হয় না। তবে, আমরা সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ বিষয়টি জানিয়েছি। সংসদ সচিবালয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি ভুয়া স্টিাকার শনাক্ত করতে আমরা আরও বেশি তৎপর হব।

এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, স্টিকারের অপব্যবহার বন্ধে সংসদ সচিবালয় সতর্ক রয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সংসদের কিছু কর্মকর্তাকর্মচারীকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। সংসদ সদস্য ও সংসদ সচিবালয়ের মনোগ্রামযুক্ত স্টিকারে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন স্টিকারের সঙ্গে পুরনো স্টিকারের কোনও মিল নেই। এতে নকল স্টিকার ব্যবহারকারীদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts