September 24, 2018

অন্ধকার পথ আগেও পাড়ি দিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা

ডেমোক্র্যাট

ডেমোক্রেটিক পার্টির ঘাঁটি বলা হয় নিউ ইয়র্ক শহরকে। গত বুধবার শহরটির মেজাজও যেন ছিল দলটির মতোই—ধূসর, বিষণ্ন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন হিলারি ক্লিনটন। যে হোটেলে তিনি ফল-পরবর্তী বক্তব্য দেন তার বাইরে সমর্থকদের ভিড়। তাদের উদ্ভ্রান্ত চোখ-মুখই বুঝিয়ে দিচ্ছে, ফলাফল বিশ্বাস করতে পারছে না।
চোখে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এক তরুণী, ‘আমার মন ভেঙে গেছে। আমরা যতটা ভালোবেসেছি তারা ঠিক ততোটাই ঘৃণা করেছে। আর সেটা আমাদের। তাদের জয়ের কারণ এটাই।’ আগের রাতে ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পরও তা মানতে পারছিল হিলারিভক্তরা। পরিস্থিতি ছিল অনেকটা এমন যে, যা ঘটছে তা দুঃস্বপ্ন। শিগগিরই সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে সকাল হতে হতেই সেই ঘোর কেটে গেছে। যদিও অবিশ্বাস কাটেনি। তার পরও বাস্তবতার সামনে দাঁড়াতে শুরু করেছেন কোনো কোনো ডেমোক্র্যাট। হারের কারণ কী, এখন কী করা যেতে পারে, ঘুরে দাঁড়ানোর কোন কোন পথই বা খোলা আছে—ভাবছে অনেকেই। কারনে ওবেহার্ট বলছিলেন, ‘শ্রমজীবী মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত। এদের সমর্থন আমরা হারিয়েছি। আমরা সংখ্যালঘুদের দিকে এত বেশি মনোযোগী ছিলাম যে শ্বেতাঙ্গদের দিকে তাকাবারই সময় পাইনি। এদের একটা বড় অংশ একসময় ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক ছিল।’ পেনসিলভানিয়া, উইসকনসিন ও মিশিগানের মতো ক্রমেই শিল্পহীন হয়ে পড়া এলাকাগুলোয় খুব অল্প ব্যবধানে হেরেছেন হিলারি। এসব রাজ্যে জোর প্রচার চালান ট্রাম্প। এই রাজ্যগুলোর শ্বেতাঙ্গ গ্রামীণ ভোটাররা একসময় ডেমোক্রেটিক পার্টির একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকে পরবর্তী সময়ে এঁদের ভোটই দলকে ক্ষমতা পাইয়ে দেয়। ইভ হামমন বলছিলেন, ‘আমাদের কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছেন এমন শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা সমানে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। আবার হিলারির প্রতি দলের একনিষ্ঠ সমর্থনকেও ভালো চোখে দেখছেন না অনেক সমর্থক। ২০১৩ সালে হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর থেকেই দলে তাঁকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড় করানোর জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে দলের নেতৃত্ব, প্রচার কর্মকর্তা, নির্বাচিত সদস্যরা এমনকি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পর্যন্ত একই কাতারে দাঁড়িয়ে যান। হিলারির হোয়াইট হাউসের রাস্তা পরিষ্কারের কাজ শুরু হয় তখনই। হিলারির নেতিবাচক দিকগুলো ডেমোক্রেটিক পার্টি বিবেচনা করেনি। হিলারির ই-মেইল বিতর্ক বা অজনপ্রিয় নেতা হবার বিষয়টি সামনে থাকলেও চূড়ান্তভাবে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাঁকে।’ ডেমোক্রেটিক পার্টির একতার জন্য হিলারির জয় অপরিহার্য ছিল। বুধবার রাতে তিনি যখন পরাজয় মেনে নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে যান, তখন দলের ঐক্যও তার পিছু নেয়। একেবারে অগোছালো হয়ে গেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। ২০০৮ সালে ওবামা যখন দায়িত্ব নেন পুরো দল তাঁর পিছে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এর সঙ্গেই ছিল হাউসে ডেমোক্রেটিক আধিপত্য। সব মিলিয়ে ওবামার যুগটিকে ডেমোক্র্যাটদের জন্য স্বর্ণযুগ বলা চলে। তবে হিলারি ওবামার সেই উত্তরাধিকার কাঁধে তুলে নিতে পারলেন না। একটি দলের আশা হিসেবে বিবেচনা করা হয় তরুণ নেতৃত্বকে। সেদিক থেকেও ডেমোক্র্যাটরা পিছিয়ে আছে। দলের নেতৃত্বে থাকা নিউ ইয়র্কের সিনেটর চালর্স শুমার বা ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেস ওম্যান ন্যান্সি পেলোসির নেতা হিসেবে জাতীয় আবেদন নেই। পরের ধাপে আছেন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও শ্যারোড ব্রাউন—এরা ষাটোর্ধ্ব। প্রাইমারির সময় আশা জাগিয়েছিলেন বার্নি স্যান্ডার্স। তিনি এখন ৭৫-এ। ফলে দলের নেতৃত্বের পর্যায়েই শূন্যতা আসন্ন। তবে ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য এই অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম নয়। ২০০০ সালেও একই অবস্থায় পড়েছিল দলটি। তবে পরবর্তী সময়ে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশের ইরাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং এর থেকে বের হতে না পারা, একই সঙ্গে হ্যারিকেন ক্যাটরিনার মতো দুর্যোগ সামাল দিতে ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে আবার পায়ের তলে মাটি ফিরে পায় দলটি। কাজেই ট্রাম্প যতই ওবামার উত্তরাধিকারকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নিঃশেষ করার চেষ্টা করুন, সফল হবেন না। হয়তো দলটির সামনে এখন দীর্ঘ অন্ধকার পথ, তবে এরকম পথ চলার অভিজ্ঞতাও তাদের আছে। সূত্র : বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, এনবিসি।

Related posts