December 19, 2018

অনুমোদনহীন সব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল বন্ধের উদ্যোগ

ঢাকাঃ সারা দেশে অনুমোদনহীন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলসহ অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। অনুমোদন নিয়ে যারা অবৈধ শাখা চালাচ্ছে তাও বন্ধ করে দেয়া হবে। স্কুলের মনিটরিং সেল, ভর্তি ফি নির্ধারণসহ আরো কিছু শর্ত দিয়ে নীতিমালা করা হচ্ছে। সম্প্রতি নানা অভিযোগে পীস স্কুল বন্ধ হওয়ার পর এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। দেরিতে হলেও অবশেষে অবৈধ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তবে বন্ধের আগে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের বিষয়টি মাথায় রাখার জন্য অনুরোধ জানান তারা।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর এসএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, একজন মিষ্টির দোকানদার ট্রেড লাইন্সেল নিয়ে ব্যবসা করেন। আর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাবে তাও অনুমোদন ছাড়া। এটা হয় না। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে সরকারের নিয়ম-নীতি অবশ্য মানতে হবে। আমরা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া অনুরোধ করেছি। তিনি বলেন, যারা নিবন্ধন নেয়নি শুধু তারা নয়, যারা অনুমোদন নিয়ে অবৈধ শাখা পরিচালনা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মাহবুবুর রহমান বলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো বৃটিশ কাউন্সিলের সিলেবাস ও কারিকুলাম পড়ান। তারা যেহেতু আমাদের সিলেবাস, কারিকুলাম ফলো করে না তাই তাদের খবরদারি আমরা করতে পারি না। শিক্ষা বোর্ড একটি রেজিস্ট্রশন দেয়। যারা রেজিস্ট্রশন না দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যাগ নিলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শুধু ইংলিশ মিডিয়াম নয়, প্রি-ক্যাডেট মাদ্‌রাসা, সাধারণ স্কুলসহ যারা বাংলা সিলেবাস পড়ান এ রকম কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনহীন। এ রকম যারা অনুমোদন ছাড়া চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে শুরু হবে। ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান আর চলতে দেয়া হবে না। তবে বছরের মাঝামাঝি সময় এসে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অভিভাবকদের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট আমিনা খাতুন রত্না বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়া যোগ্য। তবে বছরের মাঝামাঝি সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে সন্তানকে কোথায় নিয়ে যাবে।

অভিভাবকদের ঐক্য ফোরামের চেয়ারম্যান জিয়াউল কবির দুলু বলেন, বন্ধ না করে এসব প্রতিষ্ঠানের মনিটরিং বাড়ানো, যারা নিবন্ধন নিতে চায় দ্রুত সময়ে তাদের নিবন্ধন দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, সরকারের মনিটরিং-এ অভাবে এসব প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠেছিল। হঠাৎ করে কেন বন্ধ করলে শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে। সরকারের ভুলের জন্য তারা কেন ভোগান্তিতে পড়বে। এজন্য বন্ধ না করে যারা নিবন্ধন নেয়নি তাদের সেই সুযোগ করে দেয়া উচিত। আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বাংলা বাধ্যতামূলক, টিউশন ফি নির্ধারণসহ কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ১৬৫টি প্রতিষ্ঠান বোর্ড থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। তবে অনিবন্ধিত এই ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে অনেক। এর সঠিক তথ্য বোর্ড বা মাউশি’র কাছে নেই। ২০১১ সালে শিক্ষা বোর্ডগুলো অনুমোদনহীন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এসব স্কুলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং ভর্তি ফি ও মাসিক বেতন নির্ধারণ করে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের কর্তৃত্ব আরোপ করার চিন্তা ভাবনা করা হয়।

কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে দেশে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের জন্য একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের জন্য নির্দেশনা দেন উচ্চ আদালত। সে অনুযায়ীর দ্রুতই ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের জন্য খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের কর্মকর্তারা এ নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি। উল্টো এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য ওই সময়ের যুগ্ম সচিব (মাধ্যমিক) এএস মাহমুদকে (বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব) আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়, যাতে প্রাধান্য দেয়া হয় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রধানদের। ওই কমিটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরিতেই তিন মাস সময় ক্ষেপণ করলেও এখন তা আলোর মুখ দেখেনি।

সম্প্রতি গুলশান হামলা ও পিস স্কুল বন্ধ হওয়ার পর জোরেশোরে মাঠে নেমেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, শুধু ইংলিশ মিডিয়াম নয়, প্রি-ক্যাডেট মাদ্‌আসা, সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় নিবন্ধন ছাড়া হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান চলছে। সরকার এগুলো বন্ধ বা বাগে আনার উদ্যাগ নেয়া উচিত।

যেভাবে চলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল: রেজিস্ট্রেশন অব প্রাইভেট স্কুলস অর্ডিন্যান্স-১৯৬২’র অধীনে ২০০৭ সালে একটি নীতিমালার আলোকে বেসরকারি (ইংরেজি মাধ্যম) বিদ্যালয়ের সাময়িক নিবন্ধন প্রদান শুরু হয়। যদিও অধিকাংশ ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এই নীতিমালার অধীনে নিবন্ধন কার্যক্রমে আগ্রহ দেখায়নি। প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলকে প্রথমে সাময়িক অনুমোদন দেয়া হয় দু্থবছরের জন্য। এরপরে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও মান যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনানুসারে আরও দু’বছর কিংবা পাঁচ বছরের সাময়িক নিবন্ধন দেয়া হয়। স্থায়ীভাবে এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন দেয়ার নিয়ম নেই। পাঁচ বছর পর পর স্কুলের কার্যক্রমের ওপর তদন্ত প্রতিবেদন প্রণয়নের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ভাড়া বাড়িতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠার সুযোগ না থাকলেও বেশির ভাগ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলই ভাড়া বাড়িতে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড জানায়, চারটি পর্যায়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের অনুমোদন দেয়া হয়।

এর মধ্যে প্রাইমারি (কিন্ডার গার্টেন) থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অনুমোদন দেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত মাউশি, ‘ও’ (অর্ডিনারি) এবং ‘এ’ (অ্যাডভান্সড) লেভেলের অনুমোদন দেয় শিক্ষা বোর্ড। ২০১৫ সালের সরকারের শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান বুরো (বেনবেইস) প্রতিবেদনে ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো তথ্য না থাকলেও ২০১১ সালের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, সারা দেশে তিন ক্যাটাগরিতে ১৫৯টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ‘ও’ লেভেল ৬৪টি এবং ‘এ’ লেভেল স্কুল ৫৪টি এবং জুনিয়র লেভেলের আন্তর্জাতিক মানের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আছে ৪১টি। এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি সিলেবাস অনুসরণ করছে। শিক্ষানীতি-২০১০ এ বলা হয়েছে, ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন যেহেতু একটি বিদেশি ধারায় হয় সেহেতু ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলকে বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হবে।

সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে এই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হবে। তবে ২০১৩ সালে উভয় ক্ষেত্রে সাধারণ ধারার সমপর্যায়ের বাংলা এবং বাংলাদেশ স্টাডিজ পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ দু’টি বিষয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্তি সাপেক্ষে ‘ও’ লেভেল উত্তীর্ণকে এসএসসি এবং ‘এ’ লেভেল উত্তীর্ণকে এইচএসসি’র সমমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি সব স্কুলকেই দেশের সব জাতীয় দিবস যথাযথভাবে উদযাপন এবং সব ধরনের অপসংস্কৃতি চর্চা পরিহারের কথা বলা হয়েছে।মানবজমিন

Related posts