November 16, 2018

‘অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীর অবস্থান জনগণের বিপক্ষে’

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার সমালোচনা করে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘একাত্তরে যেসব বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছে তারা ছিলেন মনেপ্রাণে দেশপ্রেমী। তারা সংকটে ও সম্ভাবনায় জনগণের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু আজকের সংকটে দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী জনগণের বিপক্ষে অবস্থান করছেন। আপাতদৃষ্টিতে এ অবস্থান স্বাধীনতার পক্ষে মনে হলেও গভীরে তাকালে দেখবো এটা উগ্রগোষ্ঠীকে মদদ দিতে সহায়তা করছে।’

একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে সোমবার বিকেলে বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ উপলক্ষে একক বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, ‘একাত্তরে যেসব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল তারা সরকার পক্ষের নয়, জনগণের পক্ষের মানুষ ছিলেন। সমকালীন উপযুক্ত সিদ্ধান্তে ভুল না করায় এর যে শক্তি তা উপলব্ধি করতে পেরেছিল পাকিস্তানীরা। আর সে কারণেই দেশকে পঙ্গু করার অভিপ্রায়ে প্রাণে শেষ করে দেয় এদেশের বুদ্ধিজীবীদের।’

সর্বক্ষেত্রে দেশের স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছে এ প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো কিছুর গভীরে প্রবেশ করতে চাই না। না শিক্ষায়, না সাহিত্যে, না রাজনীতিতে। ফলে সর্বক্ষেত্রে আমাদের স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছে। পরিণামে বিকাশ ঘটেছে পুঁজিবাদের। আর এর যে ফল তা তো আমরা প্রতিদিনই দেখতে পাচ্ছি।’

বাংলা একাডেমির বানান সংস্কারের বিষয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অযাচিতভাবে বাংলা একাডেমির বানানের দীর্ঘরীতিকে হত্যা করা হল। যেসব বানানে ী’ কার ছিল তার ৭০ ভাগ ‘ি’ কার হয়েছে। এমনকি আইন তৈরি করে ‘বাংলা একাডেমী’ বানান পরিবর্তন করে ‘বাংলা একাডেমি’ করা হয়েছে। এসবের কোনো দরকার ছিল না। সকলের মনে রাখা দরকার অভিধান ভাষা তৈরি করে না বরঞ্চ ভাষাই অভিধান তৈরি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে পারি নি বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নির্যাতন, হত্যা, ছাত্র-শিক্ষকের সমন্বয়হীনতাসহ অসংখ্য অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটা ক্রমশ শিক্ষিত মানুষের বস্তিতে পরিণত হচ্ছে। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাস আমাদের সকলের জানা। ছাত্র সংসদ ছাড়া পৃথিবীতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যায় কী না সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে। বাস্তবতা হল দুই দশক ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নেই।’

গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমরা যেসব আশার আলো দেখছিলাম তার মধ্যে একটি ছিল গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন। ভেবেছিলাম এটির মাধ্যমে দেশের নাটক প্রান্তিকে ছড়িয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কী হল? নাটকে বাঙালি ও বাংলাদেশের যাপিত জীবন নিয়ে এ আন্দোলন প্রান্তিকে পৌঁছল না। কারণ, এখানেও গভীরে প্রবেশের অভাব।’

বর্তমান সংকটের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে, শিক্ষা বিভাজিত হয়েছে, রাজনীতিতে ধর্মের আশঙ্কাজনক অপব্যবহার হয়েছে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক শূন্যতা।’

বর্তমান সংকট উত্তরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংকট উত্তরণের একমাত্র উপায় হল-সমাজ বিবর্তন। সে বিবর্তনে কেবল ধনিক শ্রেণীকে গুরুত্ব না দিয়ে বিরাট সংখ্যক দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।’

বাংলা একাডেমির অদূরে ও স্বাধীনতার স্মৃতি বিজড়িত স্থানে ঢাকা ক্লাব থাকার আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন ছিল জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমিকে ঘিরে একটি সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে উঠবে। কিন্তু হল না। তৈরি হল ঢাকা ক্লাবের মতো প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে দেশের বুদ্ধিজীবীরা কিছু বলল না। জানার চেষ্টা করল না এখানে মানুষ কেন যায়, কী করে ও সদস্য হলে কত টাকা লাগে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটি উঠিয়ে সে স্থানে সংস্কৃতিচর্চার স্থান হতে পারে।’

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আহমদ কবির, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, লেখক শান্তনু কায়সার প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ড. তানভীর আহমেদ সিডনী। ইমিরেটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের কবিতার অংশ নিয়ে কোলাজ আবৃত্তি করেন কাজী মদিনা। মুনীর চৌধুরীকে লেখা আবু হেনা মোস্তফা কামালের খোলা চিঠি পাঠ করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।

এর আগে সকালে একাডেমির পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বুদ্ধিজীবী সমাধি, মিরপুরস্থ শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।দ্য রিপোর্ট

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts