November 16, 2018

অজুহাত খুঁজছে শরিকরা!

২০ দলীয় জোট ছাড়তে অজুহাত খুঁজছে কয়েকটি ইসলামী দল। পৌর নির্বাচনসহ কয়েকটি বিষয়কে ইস্যু বানাতে চাইছে তারা। এ তালিকার শীর্ষে রয়েছে সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে যাওয়া ইসলামী ঐক্যজোট ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। এছাড়া জামায়াতকে নিয়েও সন্দেহ দানা বাঁধছে। বিশেষ করে শনিবারের বৈঠকে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত না থাকায় তাদের জোট ছেড়ে দেয়ার গুঞ্জন ডালপালা মেলছে। বিএনপির মধ্যে এ নিয়ে নানা আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে অহেতুক অজুহাত দেখিয়ে কেউ জোট ছাড়তে চাইলে তাদের ধরে রাখতে কোনো চেষ্টাই করবে না বিএনপি। বরং ইসলামপন্থী দলগুলো জোট ছাড়লে বিএনপি বোঝামুক্ত হবে। এমনটিই জানিয়েছে বিএনপির কয়েকজন নীতিনির্ধারক।

২০ দলীয় জোট সূত্রে জানা যায়, জোটের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে জামায়াত ছাড়া অন্য শরিক দলগুলোকে গুরুত্ব না দেয়ার অভিযোগ বিএনপির বিরুদ্ধে বেশ আগ থেকেই ছিল। চলতি বছরে সরকারবিরোধী আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর জোটের নিয়মিত বৈঠক না হওয়া এবং জামায়াতসহ জোটের অন্য শরিকদের আগের মতো গুরুত্ব না দেয়ায় টানাপোড়েনের মাত্রা কিছুটা বাড়ে। কিন্তু আসন্ন পৌর নির্বাচনে জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও এলডিপি ছাড়া কাউকে কোনো ছাড় না দেয়ায় সে মাত্রা চূড়ান্ত পর্যায় গিয়ে পৌঁছে। যার কারণে ক্ষুব্ধ জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের কোনো প্রতিনিধি শনিবার ২০ দলের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। এ নিয়ে বৈঠকে অন্যান্য দলের মহাসচিবরা ফখরুলের কাছে জানতে চান। ফখরুল তাদের বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে জামায়াত এবং জেলা কাউন্সিল থাকায় ঐক্যজোটের নেতারা আসতে পারেনি। তবে তার এই বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারেননি অনেকে। এর পেছনে অন্য কারণ থাকতে পারে বলে বৈঠকেই একজন ইঙ্গিত করেন। এ ব্যাপারে বৈঠকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আরও বলেন, দু’একজন না এলে কি হবে। তাতে কাজ থেমে থাকবে না। আমরা চালিয়ে যাব।

এ বিষয়ে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, শনিবার মহাসচিবদের যে বৈঠক হয়েছে, তাতে আমাদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল না। আর আমরাও ওই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে হ্যাঁ বা না কিছুই বলছি না। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি ও দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে জোট ছাড়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেননি তারা।

এদিকে ঐক্যজোটের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দলের একটি অংশ ইতিমধ্যে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। সঠিক সিগন্যাল পেলেই তারা জোট ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারে। তবে ঐক্যজোটের অপর একটি অংশ শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে থাকতে চায়। ইতিমধ্যে এ নিয়ে দলটির মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে চারদলীয় জোট প্রতিষ্ঠার সময় থেকে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক বড় রাজনৈতিক সংগঠন ‘ইসলামী ঐক্যজোট’ বিএনপির সঙ্গে আছে। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের পর থেকে মূলত বিএনপির সঙ্গে ঐক্যজোটের দূরত্ব রচিত হয়। এরপর ব্যর্থ আন্দোলন ও প্রতিটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ’বঞ্চনা’কে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ও দূরত্ব দীর্ঘ হতে থাকে। সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে জোটগতভাবে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী ঘোষণা না করায় চূড়ান্তভাবে সম্পর্কের অবনতি হয়। তারা জোটের কাছে ১০টি পৌরসভার জন্য ছাড় চেয়ে একটিও পায়নি।

এ পরিস্থিতিতে নয় বছর পর মহান বিজয় দিবসে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির আতিথেয়তা গ্রহণ করেন ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী, মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মুফতি আমিনীর বড় ছেলে আবুল হাসনাত আমিনী এবং দলটির অপর এক শীর্ষনেতা মাওলানা জুবায়ের আহমেদ। সেখানে উপস্থিত হন জোটের আরেক শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নির্বাহী সভাপতি মুফতি মুহম্মদ ওয়াক্কাস, মহাসচিব মহীউদ্দিন একরাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি রেজাউল করিম।

এ বিষয়ে মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, বঙ্গভবনে গেলেই কি জোট ভেঙে যায়? এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

জানা গেছে, পৌরসভা নির্বাচনে ইসলামী দল বা জামায়াত নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ নেই বিএনপির হাইকমান্ডের। যার কারণে জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ও এলডিপিকে একটি করে ছাড় দিয়ে বাকি পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি জোটের বৈঠকে খালেদা জিয়া ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে মাঠে নামতে জোট নেতাদের আহ্বান জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয় জামায়াত। আর তাই খালেদা জিয়ার নির্দেশের পরও স্থানীয়ভাবে বিএনপি নেতারা সমঝোতা করার উদ্যোগ নিলেও জামায়াত তাতে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি।

জানা গেছে, ইসলামী ঐক্যজোট নরসিংদী সদর এবং বগুড়া সদও পৌরসভায় প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদীতে তাদের প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হলেও বগুড়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে দলটি। তারা বিএনপির কাছে ২টি মেয়র পদ চান। অন্ততপক্ষে একটিতে ছাড় দেবে বলে তাদের প্রত্যাশা ছিল। এ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন আমিনীর ছেলে। কিন্তু তারপরও বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় তারা। যার ফলে শনিবারের বৈঠকে দলের কোনো প্রতিনিধিকে পাঠানো হয়নি। এদিকে দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জোটের শরিক হিসেবে কোনো মূল্যায়ন না করায় পরবর্তী করণীয় নিয়ে শিগগিরই দলের বৈঠক ডাকা হবে। ওই বৈঠকেই আসতে পারে জোট ছাড়ার ঘোষণা।

ইসলামী ঐক্যজোট মতো খেলাফত মজলিসও বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ। পৌর নির্বাচনে তাদের কোনো ছাড় দেয়া হয়নি। এমনকি দলটির নেতাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনো আলোচনাও হয়নি। বিএনপির এ অবহেলার কারণে তারাও একক প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়। টাঙ্গাইল শহর, মানিকগঞ্জের সিংগাইর, সিলেটের জকিগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে প্রার্থী দিয়েছে খেলাফত মজলিস। দলটির মহাসচিব আহমেদ আবদুল কাদের বলেন, এখন তো প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। আর বিএনপি বললেও আমরা আমাদের প্রার্থীদের নির্বাচনে বিরত থাকতে বলব না।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয়ভাবে এ ব্যাপারে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা তারা দেখছে না। তাই সাংগঠনিক সম্পাদকদের স্থানীয়ভাবে জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বিএনপির হাইকমান্ডের ধারণা, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। সরকার ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পৌরসভাগুলোয় তাদের প্রার্থীদের বিজয়ী করবে। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে- এমন পরিবেশ তৈরি হলে ভোটের আগের দিনও জোটগতভাবে একক প্রার্থী দেয়ার ব্যাপারে বিএনপি জোর চেষ্টা করবে।

বিএনপির সূত্র মতে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে দল হিসেবে জামায়াতকে নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী এই দলটির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জোটে থাকা ইসলামী ঐক্যজোটসহ ইসলামী দলগুলোর বিরুদ্ধেও মৌলবাদের অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বিএনপিকে এসব মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গ ত্যাগেও আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। দলের বড় একটি অংশও শুরু থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করেন না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হচ্ছে বিএনপি। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রয়োজনে ২০ দলীয় জোট গঠন করেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এখন যদি কেউ জোট ছেড়ে চলেও যায় তাতে বিএনপিরই লাভবান হবে। বিশেষ করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নাশকতার অভিযোগ জোটের ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রতি সবচেয়ে বেশি। তাই এ মুহূর্তে তারা চলে গেলে প্রাকারান্তরে বিএনপির বোঝা অনেক কমে যাবে।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে দলীয় ফোরামে যা সিদ্ধান্ত নেয়ার নেবেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts